শিশু এবং সবুজ পৃথিবী – ১ম পর্ব

বর্তমান পৃথিবী এবং শিশু

পৃথিবীতে যখন একটি শিশুর আগমন ঘটে, তখন আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি সেই শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে। এটাই স্বাভাবিক আর এমনটাই হওয়া উচিত কারন একটি শিশু শুধু একটি জীবন্ত প্রান ই নয় বরং একটি শিশু একজন বাবার স্বপ্ন , মায়ের সম্বল , পরিবারের আনন্দ , পৃথিবীর সম্পদ। কারন এই শিশুটিই হয়তো একদিন পৃথিবীর সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিবে , হয়তো এই শিশুই বাবা-মায়ের স্বপ্ন কে বাস্তব করে তুলবে। কিন্তু আমরা সেই শিশুর নিরাপত্তার জন্য পৃথিবীকে ঠিক কতটুকু গড়ে তুলছি , শিশুটির জন্য পৃথিবীটা কি আসলেই নিরাপদ হচ্ছে ? “শিশু এবং সবুজ পৃথিবী” আপনি কি মনে করেন ,বর্তমান পৃথিবী শিশুর জন্য উপযুক্ত? আচ্ছা চলুন কিছু সমস্যা দেখা যাক , যা আমাদের এটা দেখিয়ে দিবে যে , বর্তমান পৃথিবী কি নিরাপদ ?

  • গাছ নিধন
  • বন উজাড়
  • অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা
  • গাড়ির কালো ধোয়া
  • মানুষের মাঝে পরশ্রীকাতরতা বেড়ে যাওয়া

এখানে মাত্র কয়েকটা কারন তুলে ধরলাম , যা বর্তমান পরিবেশের জন্য ভয়ংকর । আর এই সমস্যা গুলো বেশি দেখা যায় দক্ষিন এশীয় অঞ্চল এবং অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশ গুলোতে। এই সমস্যা গুলো সামনে রেখে আপনি কি বর্তমান পৃথিবীকে একটি শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় বলতে পারেন ?

এই পরিবেশ শিশুর জন্য কতটুকু নিরাপদ ?

কিভাবে পৃথিবী হবে শিশুর উপযুক্ত , যা একটি শিশুকে সুন্দর আগামী উপহার দিবে ?

আপনি কি মনে করেন “সবুজ পৃথিবী” হতে পারে এর সমাধান ? তাহলে চলুন , আমরা চেষ্টা করি সবুজ পৃথিবী তৈরীর মাধ্যমে আমরা একটি শিশুকে উপহার দেই সুন্দর , নির্মল , বিশুদ্ধ এবং নিরাপদ জীবন।

সবুজ পৃথিবী কি ?

আমরা তো একটি শিশুকে সবুজ পৃথিবী উপহার দিব কিন্তু যদি প্রশ্ন হয় , সবুজ পৃথিবী কি ? এর মাধ্যমে কি সকল পরিবেশীয় সমস্যার সমাধান হবে ? চলুন উত্তর খোজা যাক , সবুজ পৃথিবী বলতে আমরা সেটাই বুঝি , যা বৃক্ষের অধিক রোপনে তৈরী এক অন্য জগৎ । এটা অন্য জগৎ কারন হলো এই জগৎ এ বৃক্ষ রোপনের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয় পৃথিবীর আসল রুপকে। বলা যায় , একটি শিশুর জন্মের পর , একটি গাছ রোপন করে ফেলো যে গাছটি বেড়ে উঠবে শিশুটি বড় হওয়ার সাথে সাথেই। বৃক্ষ রোপনের মাধ্যমে “পৃথিবীকে সবুজ রাখুন, আরো সবুজ করুন” যা একটি শিশুর কাছে প্রতিনিয়ত পৃথিবীকে সবুজ করে ফেলে । আর এটা মনে রাখবেন , পৃথিবী সবুজ আর সুন্দর হলেই ঠিকে থাকবে সভ্যতা , বেঁচে থাকবো আমরা।

শিশুর জন্ম আর বৃক্ষের অঙ্করোধম গেথে যাক এক সূত্রে

সারাদেশকে তথা সারা পৃথিবীকে সবুজে রূপান্তরিত করার জন্য বৃক্ষরোপণ করার মাধ্যমে সবুজ পৃথিবী গঠন সম্ভব। প্রশ্ন হতে পারে , কি লাভ হবে সবুজ পৃথিবী গড়ে ? পৃথিবী তো এগুচ্ছে, পৃথিবীর মানুষেরা এগিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তিকে সাথে নিয়ে , মানুষের জীবন যাত্রা হয়ে যাচ্ছে সহজ এবং আরামপ্রিয়। এতসব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ক্যানো আমরা বৃক্ষ রোপন করে অযথা সময় অপচয় করবো ?
আচ্ছা , আপনি কি বলতে পারেন “পৃথিবী আর কতদিন ঠিকে থাকবে” ? “পৃথিবীর মানুষেরা আর কতদিন বিশুদ্ধ পরিবেশ পাবে “? জানি বলতে পারবেন না কারন আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন প্রযুক্তির সাথে আর পিষে মারছেন সবুজ বৃক্ষরাশিকে। কিন্তু এটা জানেন কি , সদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর অবস্থা কতটা ভয়াবহ হবে? কোনো কোনো বিজ্ঞানী তো বলেই দিয়েছেন , এই পৃথিবী আর সর্বোচ্চ ১০০ বছর ঠিকবে। তাহলে ১০০ বছর পর পৃথিবীর কি হবে ? গবেষনা বলে জলাবায়ু বিপর্যয়ের কারনে আগামী ১০০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর বেশির ভাগ নিম্ন অঞ্চল গুলো প্লাবিত হবে , অপরিকল্পিত অঞ্চল গুলো হয়ে যাবে বসবাস অযোগ্য , পৃথিবীতে কমে যাবে জীবের সংখ্যা। একবার ভাবুন , আমরা ঠিক সেই সময় টাতে আছি , তখন আমাদের কি করার আছে ? শুনতে খারাপ লাগলেও এটা সত্যি যে ,আমাদের আসলে কিছুই করার থাকবে না। তাহলে এর থেকে মুক্তির উপায় কি ? আমাদের আগামীর জন্য আমরা কি করে রেখে যাব ? আমাদের কি উচিত না , আমাদের বর্তমান প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী গড়ে রেখে যাওয়া ? সুন্দর হোক শিশুর জীবন এটা কি আমাদের চাওয়া হতে পারেনা ? যদি আমরা এটা চাই , তাহলে পৃথিবীকে গড়ে তুলতে হবে বসবাসযোগ্য করে আর এটা সম্ভব পৃথিবীকে সবুজ দিয়ে সাজানোর মাধ্যমে। পৃথিবীর জলবায়ু স্বাভাবিক তখন ই হবে যখন পর্যাপ্ত বৃক্ষরাশি দিয়ে পৃথিবীকে সাজানো যাবে।

হোক না সবুজের সমারোহ

গাছ আমাদের প্রয়োজন কেনো ?

আপনাদের কি মনে আছে , বাংলাদেশে সংঘঠিত ২০০৭ সালের ঘুর্নিঝড় সিডরের কথা , যে ঘুর্নিঝড়ে প্রান হারিয়েছিল প্রায় ১০ হাজার মানুষ (বেসরকারি হিসাব) ,শুধু তাই নয় মানুষের সাথে ভেসে গিয়েছিল কয়েক লক্ষাধিক গবাদি পশু। কিন্ত আপনি কি জানেন , ভয়ংকর হয়ে উঠা সিডরের তুলনায় বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল অনেক কম। কিন্তু এমনটা কেনো হয়েছিল ? গবেষকরা মনে করেন , সুন্দরবনের বৃক্ষরাশিই ছিল একমাত্র কারন যা সিডরের শক্তি অনেকটা একাই মোকাবেলা করেছে। যদি আপনি ইতিহাস দেখেন , তাহলে দেখবেন অনেক ঘুর্নিঝর , জলোচ্ছ্বাস , ভাঙ্গন এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দিয়ছে অতন্ত প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে থাকা বনাঞ্চল গুলো। গাছ কি শুধু আমাদের প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকেই রক্ষা করে যাচ্ছে ? না, বরং আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনও গাছ একা সরবরাহ করে যাচ্ছে। আচ্ছা আপনাকে একটা প্রশ্ন করি, বলুন তো, কারা নিজের খাবার নিজে তৈরী করে? কি , বলতে পারছেন না ? তাহলে শুনুন , একমাত্র গাছ ই নিজের খাবার নিজে তৈরী করে। শুধু নিজের জন্যেই না বরং সমস্ত প্রানী জগতের খাবার তৈরী করে একমাত্র গাছ ই। আমাদের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তৈরীতে কাঠ যোগান দেয় গাছ। এত সব উপকারের পরে আমরা কি অস্বীকার করব যে , সবুজ বৃক্ষরাশির গাছের দরকার আমাদের নেই ?

চলুন এবার দেখা যাক , একজন শিশুর সাথে গাছের কি সম্পর্ক হতে পারে।

শিশু এবং গাছ বা বৃক্ষ হয়ে উঠুক একে অপরের পরিপূরক

বিশ্ব জনসংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে , তার তুলনার গাছের সংখ্যা বা বনাঞ্চলের পরিমাণ সেভাবেই বৃদ্ধি পাচ্ছে না। বরং, অবস্থা এমন হয়ে দাড়িয়েছে যে একজন শিশুর জন্মের সাথে একটা করে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু হওয়া উচিত ছিল , প্রতিটি শিশুর জন্মের সাথে অন্তত একটি করে গাছ লাগানো , যাতে করে পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক থাকে। বন সমীক্ষা তথ্য অনুযায়ী মোট আয়তনের অন্তত ২৫% বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে এর পরিমাণ খুবই লাজুক। বেসরকারি মতে যদিও আমাদের দেশে বনাঞ্চলের পরিমাণ ১৭% কিন্তু ইউনেস্কো তথ্য অনুযায়ী এর পরিমাণ মাত্র ১০%। তাহলে একটু ভেবে দেখুন , আমরা কি অবস্থায় রয়েছি। বনাঞ্চলের প্রভাবে বৈশ্বিক জলবায়ু যেভাবে পরিবর্তন হচ্ছে , তাতে খুব বেশি দিন বাকী নেই যেদিন , পৃথিবীতে আমাদের প্রানের অস্তিত্ত্ব একেবারে কমে যাবে।

তাহলে আমাদের কি উচিত নয় , আমাদের পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখতে বনাঞ্চল এর পরিমাণ বৃদ্ধি করা। যদি আমাদের এটা দায়িত্ত্ব হয়ে থাকে , তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে , কিভাবে বাড়াবো বনাঞ্চল আর কেই ই বা রোপন করবে এত সব বৃক্ষ? প্রশ্ন আসাটা অমূলক নয় কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার মতও না। আচ্ছা আমরা কি , বৃক্ষ রোপনের অনুপ্রেরনা হিসেবে শিশুদের বাছাই করতে পারি না ? আমাদের তো আগামী প্রজন্ম কে শিখিয়ে দিয়ে যেতে হবে , তা না হলে প্রযুক্তির এই যুগে আগামী প্রজন্ম হয়তো জানবেই না , বৃক্ষরোপন টা কি। তারা শুধু শিখে যাবে জলবায়ু পরিবর্তন এর পতিক্রিয়া আর তার সমাধান খুজবে প্রযুক্তি দিয়ে কিন্তু তারা কি এটা বুঝবে যে অতীতের বনাঞ্চল ধ্বংস করাই আজকের জলবায়ু পরিবর্তন এর প্রধান কারন।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে হলেও , আজকের শিশুর মাথায় বৃক্ষ রোপন আর এর উপকারিতা গুলো ঢুকিয়ে দিতে হবে। শিশুদের সামনে আমরা প্রতিনিয়ত গাছ সম্পর্কিত সমস্থ পজিটিভ দিক সমূহ তুলে ধরবো। যখন প্রতিনিয়ত আমরা শিশুদের এটা বুঝাতে থাকবো যে, তোমাদের প্রজন্ম কে বাঁচাতে হলে বাড়াতে হবে বনাঞ্চলের পরিমাণ, বৃদ্ধি করতে হবে বৃক্ষরোপণ। আর এভাবেই বৃক্ষরোপনের মাধ্যমে আমরা গড়ে তুলতে পারবো আমাদের স্বপ্নের পৃথিবী।
শিশুদের গাছ রোপনের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে আমরা নিজেরাই প্রতিনিয়ত তাদের সাথে নিয়ে বৃক্ষ রোপন করতে পারি, যেন তারা আমাদের দেখে দেখে বৃক্ষরোপনের বিষয়গুলো অনুধাবন করতে পারে।

এভাবে আমরা শিশুদের নিয়ে বৃক্ষ সম্পর্কিত প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরনা দেওয়া এবং তাদের নিয়ে নিয়মিত বৃক্ষরোপণ আর পরিচর্যার মাধ্যমে গাছ ও শিশুকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গড়ে তুলতে পারবো।

আজ এ পর্যন্তই । আগামী পর্বে আমরা আলোচনার মাধ্যমে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো তুলে ধরবঃ

  • কি ধরনের গাছ লাগাতে শিশুদের উৎসাহী করব ?
  • শিশুদের লাগানো গাছ গুলোই হবে সবুজ পৃথিবী গড়ার প্রথম ধাপ
  • প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম একেকটি গাছ ঠিকিয়ে রাখবে সভ্যতাকে
  • শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ এর কান্ডারী হব আমরা
  • পৃথিবী আমার , পৃথিবী শিশুর

উপরোক্ত আলোচনা গুলোর পাশাপাশি , গাছ সম্পর্কিত আরো বিস্তারিত থাকছে পরের পর্বে।

লিখেছেনঃ
Sharif Ahammed Bijoy
Seo-Expert , RAMless IT

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *